আব্দুল আজিজ খাঁনের রাজনৈতিক বর্ণাঢ্য জীবন ছিল নানা ঘটনা প্রবাহে স্মরণীয়- বরণীয় ও আলোকিত
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার ঃ
সূচনা কথা:
আব্দুল আজিজ খাঁন কুমিল্লার রাজনৈতিক অঙ্গনের একজন পথিকৃৎ।
তার
জীবদ্যশার
৭১
বছরের
মধ্যে
৫৯
বছরই
বৃটিশ,
পাকিস্তান
এবং
স্বাধীন
বাংলাদেশের
রাজনৈতিক
জীবনের
নানা
ঘটনা
প্রবাহে
তিনি
স্মরণীয়-বরণীয় ও আলোকিত হয়ে আছে।
আজ
১৩
অক্টোবর
এ
নেতার
৩৩
তম
প্রয়ান
দিবস। (জন্ম: ১৯১৯-মৃত্যু: ১৯৯০ইং)।
৫৯ বছরের এ বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে বৃটিশ শাসনামলেই সাড়ে ৪ বছরসহ প্রায় ১৪ বছর কারা নির্বাসিত ছিলেন।
আব্দুল
আজিজ
খাঁন
একাধারে
বৃটিশের
আতঙ্ক,
ভাষা
সৈনিক,
পাকিস্তানের
স্বাধীকার
আন্দোলনের
লড়াকু,
শ্রমিক
নেতা,
মুক্তিযুদ্ধের
সংগঠক
ও
আওয়ামীলীগ
প্রতিষ্ঠাকালীন
সময়
থেকে
সংগঠক
ও
সমাজ
সেবক
ছিলেন।
রাজনৈতিক জীবন শুরুর কথা:
আব্দুল আজিজ খাঁনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির মাধ্যমে।
কারন
তৎকালীন
সময়ে
আব্দুল
আজিজ
খাঁনের
বাবা
গনী
মুক্তার
ও
আজিজ
খাঁনের
বড়
ভাই
আব্দুল
লতিফ
খাঁন
কমিউনিস্ট
পার্টির
প্রভাবশালী
নেতা
ছিলেন। বার বার রাজনৈতিক রোষাণলে বৃটিশ শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক কারানির্যাতনের
কারনে
তিনি
লেখা-
পড়ায়
খুব
একটা
এগুতে
পারেননি। কুমিল্লা বঙ্গ বিদ্যালয়ে (কুমিল্লা হাই স্কুল) সপ্তম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ফরোয়ার্ড ব্লকের রাজনীতি শুরু করার মধ্য দিয়ে বৃটিশ শাসক গোষ্ঠীর নজরে আসেন এবং সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন অবস্থায় ১২ বছর বয়সেই তিনি বৃটিশ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারা নির্বাসীত হন।
পরবর্তীতে তিনি আরএসপি (রেভুলেশনারী সোশালিস্ট পার্টি)’র অন্যতম সদস্য ও কুমিল্লা পৌরসভার মেয়র অতিন্দ্র মোহন রায়ের অনুপ্রেরণায় এবং তারই তত্বাবধানে ‘আরএসপি’তে যুক্ত হয়ে পড়েন।
এসময়
কুমিল্লার
রাজনৈতিক
অঙ্গনের
প্রথিতযশা
রাজনীতিক
ও
ভাষা
সৈনিক
ফয়জুল্লাহ
ও
আলী
তাহের
মজুমদারও
‘আরএসপি’র সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।
অপরদিকে
দেবীদ্বার
উপজেলার
রাজামেহার
ইউনিয়নের
গোবিন্দপুর
গ্রামের
বিপ্লবী
নেতা
চন্দ্র
উদয়
দত্ত
এবং
মুরাদনগর
উপজেলার
দারোরা
গ্রামের
জমিদার
বিপ্লবী
নেতা
জুবরাজ
সিং
বৃটিশদের
বিতাড়িত
করার
লক্ষ্যে
গঠিত
বিপ্লবীদের
কর্তৃক
গড়ে
তোলা
‘অনুশীলন
পার্টি’তে যুক্ত ছিলেন।
মুরাদনগর
উপজেলার
দারোরা
স্কুলের
প্রতিষ্ঠাতা
দিনেশ
চন্দ্র
সিং
এর
বাবা
জমিদার
বিপ্লবী
নেতা
জুবরাজ
সিং
এর
তত্বাবধানে
দারোরা
গ্রামে
তৎকালীন
‘অনুশীলন
সমিতি’র একটি ক্যাম্প ছিল।
বিপ্লবীদের
ওই
‘অনুশীলন
সমিতি’র ক্যাম্পে অতিন চন্দ্র রায়ের সাথে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ফয়জুল্লাহ সাহেব, আলী তাহের মজুমদার ও আব্দুল আজিজ খাঁনের।
এছাড়াও
বৃটিশ
হটাও
আন্দোলনে
কমিউনিস্ট
পার্টির
নেতা
কমরেড
অপূর্ব
কাঞ্চন
দত্ত,
কমরেড
অমূল্য
কাঞ্চন
দত্ত,
কমরেড
ইয়াকুব
আলী
(বড়
মিয়া),
আশরাফ
আলী
মজুমদারের
সাথেও
আব্দুল
আজিজ
খাঁেনর
যোগাযোগ
ছিল। তখন প্রয়াত ন্যাপ প্রধান অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ ভিক্টোরীয়া কলেজে অধ্যয়ন করতেন।
এসময়
অধ্যাপক
মোজাফ্ফর
আহমেদকে
কমরেড
অপূর্ব
কাঞ্চন
দত্ত,
কমরেড
অমূল্য
কাঞ্চন
দত্ত,
কমরেড
ইয়াকুব
আলী
(বড়
মিয়া),
আশরাফ
আলী
মজুমদারের
সাথে
পরিচয়
ও
রাজনৈতিক
সম্পর্ক
গড়ে
তুলতে
সহায়তা
করেন
ফয়জুল্লাহ
সাহেব। তখন ফয়জুল্লাহ সাহেব মোজাফ্ফর আহমেদকে ছাত্র ফেডারেশনের সাথে নিজ তত্বাবধানে যুক্ত করেন।
অধ্যাপক
মোজাফ্ফর
আহমেদ
ও
আব্দুল
আজিজ
খাঁন
সম্পর্কে
মামা-
ভাগ্নে। বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে নানা কর্মকান্ডে জড়িত এবং কমরেড ইয়াকুব আলী বড় মিয়াদের সাথে তৎকালীন কৃষক আন্দোলনে যুক্ত থাকার অপরাধে আব্দুল আজিজ খাঁন ১৯৩৪ সালে আবারো কারানির্বাসীত
হন। তিনি পরবর্তীতে ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ
দত্তের
অনুপ্রেরণায়
কংগ্রেসের
সক্রিয়
রাজনীতিতে
যোগ
দিয়ে
বৃটিশ
বিরোধী
আন্দোলন
বেগবান
করেন।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে চরমপন্থী (যুগান্তর দল) এবং নরমপন্থী (অনুশীলন সমিতি) দু’টি বিপরীত ধারার বিপ্লবীদের আন্দোলনের তোপের মুখে বৃটিশ বিতাড়িত হতে বাধ্য হয়েছিল।
এই
আন্দোলনে
ভারতের
সর্বস্তরের
মানুষ
ও
তাদের
মিলিত
আন্দোলনের
ফলে
বৃটেন
থেকে
স্বাধীনতা
লাভ
করে
ভারত
বিভাগের
মাধ্যমে
ভারত
এবং
পাকিস্তান
নামে
দু’টি রাষ্ট্র গঠিত হয়।‘
‘যুগান্তর দল’ ছিল বিপ্লবী সংস্থা চরমপন্থার মাধ্যমে ইংরেজদের কাছ থেকে দেশের স্বাধীনতা অর্জণ করাই ছিল এ সংগঠনের লক্ষ।
অনুশীলন
সমিতির
সাথে
মতভেদের
কারণে
১৯০৬
সালে
‘যুগান্তর’
এর
জন্ম
হয়। তখন এর নেতৃত্বে ছিলেন,- অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্র কুমার ঘোষ, উল্লাস কর দত্ত, ক্ষুদীরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি।
আব্দুল আজিজ খাঁন সম্পর্কে তার সহযোদ্ধা ভাষাসৈনিক আবু তাহের মজুমদার বলেছিলেন, আজিজ খান কংগ্রেস করতেন।
১৯৩৪
সাল
থেকেই
ভলন্টিয়ার্স
হিসেবে
তাকে
কাজ
করতে
দেখা
গেছে। এসময় বেশ কয়েকজন মুসলিম নেতা কংগ্রেসে যোগদান করেছিলেন।
কৃষক
আন্দোলনের
সময়
কমরেড
ইয়াকুব
আলী
(বড়
মিয়া)দের সাথে তিনিও গ্রেফতার হন এবং কলকাতার আলীপুর কারাগারে বন্দী ছিলেন।
তখন
তার
বয়স
কম
ছিল। ১৯৪০ সালে ‘আরএসপি’ গঠিত হয় তখন কংগ্রেসের একটি গ্রুপ ‘আরএসপি’তে যোগদান করেন।
প্রকৃত
অর্থে
অনুশীলন
পার্টিই
‘আরএসপি’
ছিল। যুগান্তর পার্টি যারা করেছেন তারা কমিউিনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন।’
তিনি
আরো
বলেন,
তার
সাথে
১৯৪০
সাল
থেকেই
আজিজ
খাঁনের
সম্পর্ক
ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
সময়
তিনি
রেডক্রসের
মেম্বার
ছিলেন। কৃষক আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
তার
সাথে
কৃষক
নেতা
ও
কমিউনিস্ট
পার্টির
শীর্ষ
স্থানীয়
নেতাদের
যোগাযোগ
ছিল। ভাষা আন্দোলনেও তিনি অভ‚তপূর্ব অবদান রেখেছেন।
ভাষাসৈনিক
আবু
তাহের
মজুমদার
বলেছেন,
তার
সাথে
আজিজ
খাঁনের
বাবা
গনী
মুক্তার
১৯৫৪
সালে
কুমিল্লা
কারাগারে
১
বছর
জেল
খেটেছেন। এর পর কৃষক নেতা কমরেড ইয়াকুব আলী (বড় মিয়া), আবু তাহের মজুমদার, আজিজ খাঁনসহ ১৪ জন ২ বছর ৬ মাস জেল খেটেছেন।
আওয়ামীলীগে যোগদান:
১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ জন্মলাভ করার পর তিনি মাওলানা ভাসানী এবং সোহরাওয়ার্দীর
সান্নিধ্যে
এসে
আওয়ামী
লীগের
রাজনীতিতে
সক্রিয়
হন। পরবর্তীতে চিওড়া কাজী বাড়ির কাজী জহিরুল কাইয়ুম বাচ্চু মিয়ার তিনি পাকিস্তানের প্রথম সারির বিশিষ্ট শিল্পপতি, আওয়ামীলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ছিলেন।
জহিরুল
কাইয়ুমের
মাধ্যমে
আজিজ
খাঁনের-
বঙ্গবন্ধু
ও
তার
পরিবারের
সাথে
সখ্যতা
গড়ে
উঠে। বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও পার্টি চালানোর ক্ষেত্রে জহিরুল কাইয়ুম এর সাথে আব্দুল আজিজ খাঁনও ছিলেন একজন অর্থদাতা।
এক
সময়
আওয়ামীলীগ
নেতা
অধ্যক্ষ
আবুল
কালাম
মজুমদার,
এডভোকেট
আহাম্মদ
আলী,
অধ্যক্ষ
মো.
খোরশেদ
আলম,
লাকসামের
আব্দুল
আউয়ালসহ
অন্যান্য
শীর্ষ
নেতাদের
সাথে
আ’লীগকে দলীয় গ্রæপিং এর উর্ধ্বে রেখে সুসংগঠিত করে রেখেছেন।
আব্দুল
আজিজ
খাঁন
ভাষা
আন্দোলনে
যুক্ত
থাকার
অপরাধে
তিনি
ও
তার
পিতা
গণি
মুক্তার
৫২
সালের
২২
ফেব্রুয়ারী
কারাবরণ
করেন। ওই কারণে তার বাবা আব্দুল গণি মুক্তার খাঁন, বড় ভাই আব্দুল লতিফ খাঁন, ভগ্নিপতি রৌশন আলী মুক্তার, এবং ভাতিজি জামাই এডভোকেট মোহাব্বত আলীসহ নিকট আত্মীয় অনেককেই কারাবরণ করতে হয়েছে।
আব্দুল আজিজ খানের জন্ম:
আব্দুল আজিজ খাঁন ১৯১৯ সালের ১৭ মার্চ কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ ইউনিয়নের বামনিসার গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।
তার
পিতার
নাম
আব্দুল
গনী
মুক্তার,
মাতা
সোনাবান
বিবি। আব্দুল আজিজ খানের স্মরণে বামনিসার গ্রামের নাম পাল্টে ‘আজিজ নগর’ রাখা হয়।
(কত
সালে
?) আজিজ
নগর
নামে
ডাক
বিভাগেরও
নামকরণ
করা
হয়। তিনি গ্রামে জন্ম নিলেও আইনজীবী পিতার আইন ব্যবসার কারনে ১৯৫০ সাল থেকেই কুমিল্লা শহরের কাপ্তান বাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন।
পরে
কান্দিরপাড়
এলাকায়
স্থায়ীভাবে
বসতি
স্থাপন
করেন
এবং
বর্তমানেও
সে
বাসায়ই
তার
পরিবার
অবস্থান
করছেন। কুমিল্লাতেই আজিজ খাঁনের শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন শুরু করে এখানেই বেড়ে উঠেন এবং মৃত্যুবরণ করেন।
পরিনয়ে আবদ্ধ:
আব্দুল আজিজ খাঁন বিয়ে করেন কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া গ্রামের মীর বাড়ির গোলাম মীর সাহেবের কণ্যা মুকবুলা বেগমকে। এ বিয়েটা সম্পন্ন হয় একটি নাটকীয় অধ্যায়ে।
বিয়ের
ঘটক
ছিলেন
মাওলানা
আব্দুল
হামিদ
খান
ভাসানী
এবং
বিয়েতে
উকিল
দেন
প্রয়াত
ন্যাপ
প্রধান
অধ্যাপক
মোজাফ্ফর
আহমেদ। তখন রাজনৈতিক সফরে (সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ’র নির্বাচনী এলাকা) কিশোরগঞ্জ জেলার কয়েকটি অঞ্চলে জনসভার কার্যক্রম করছিলেন তারা।
নৌকা
যোগে
এসব
জনসভায়
যেতে
হত। একটি জনসভায় নৌকাযোগে যাওয়ার পথে বাঙ্গালপাড়া মীর বাড়ির পুকুর ঘাটে এক সুন্দুরী কণ্যাকে দেখে আজিজ খাঁন বার বার পেছন ফিরে তাকাতে থাকেন, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী- আজিজ খাঁনের পেছনে বার বার তাকিয়ে থাকা এবং ছটফট করতে দেখে বুঝতে পারেন এবং তিনি বলেন,- কি পছন্দ হয়েছে ? তখন আজিজ খাঁন হেঁসে সম্মতি দিলে ফেরার পথে ওই বাড়ির ঘাটে নৌকা ভেড়ান এবং সফরসঙ্গী সবাই বাড়িতে উঠেন।
বাড়ির
লোকজন
মাওলানা
আব্দুল
হামিদ
খান
ভাসানী
ও
অধ্যাপক
মোজাফ্ফর
আহমেদকে
দেখে
কিংকর্তব্য
বিমূঢ়
হয়ে
পড়েন। তখন ভাসানী সাহেব আজিজ খাঁনের পরিবারের সাথে কথা বলে বিয়ের প্রস্তাব দিলে, তাৎক্ষণিক বিয়ের আয়োজন করা হয়।
বিয়েতে
উকিল
দেন
অধ্যাপক
মোজাফ্ফর
আহমেদ।
আব্দুল আজিজ খাঁনের আদী নিবাস:
আব্দুল আজিজ খাঁনের আদি পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার আকবপুর ইউনিয়নের মেটংগর খাঁ বাড়ি।
দেবীদ্বার
বামনীসার
গ্রামটি
ছিল
হিন্দু
ধর্মাবলম্বী
ব্রাক্ষণদের
আবাসস্থল। কথিত আছে ওই গ্রামের প্রভাবশালী ব্রাক্ষণ পরিবারের এক গৃহবধূ বামনী’র নামেই এ গ্রামের নামকরণ হয়েছিল বামনীসার।
ওই
গৃহবধূ
বামনীর
পৈত্রিক
নিবাস
ছিল
মুরাদনগর
উপজেলার
আকবপুর
ইউনিয়নের
মেটংগর। পিতার এলাকার প্রতিবেশী খাঁ বাড়ির সাথে তাদের পরিবারের ভ্রাতৃপ্রতিম
সম্পর্ক
থাকার
সুবাদে
এবং
বামনীর
সহযোগীতায়
ওই
খাঁ
বাড়ির
দু’জন বৃটিশ কর্মচারী খোয়াঁজ আলী খাঁ এবং খিজির আলী খাঁ দেবীদ্বার উপজেলার বামনীসার গ্রামে এসে স্থায়ী ভাবে বসতি স্থাপন করেন।
আব্দুল আজিজ খাঁনের বংশ পরিচয়:
খোঁয়াজ আলী খাঁর দুই ছেলে - নসুরুদ্দিন খাঁন ও নজুমুদ্দিন খাঁন।
নসুরুদ্দিন
খাঁনের
দুই
ছেলে
গনী
মুক্তার
ও
রহিম
বক্স। গণী মুক্তারের পাঁচ ছেলে শামসুদ্দিন খাঁন, আব্দুল লতিফ খাঁন, আব্দুল আজিজ খাঁন, আব্দুল মালেক খাঁন ও আবু তাহের খাঁন।
আব্দুল
আজিজ
খাঁনের
তিন
ছেলে
ও
চার
মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে বড় ছেলে বায়েজিত খাঁন লিটন মারা গেছেন।
বাকী
দুই
ছেলে
কবির
ইকবাল
খাঁন
ছোটন
ও
আবির
ইকবাল
খাঁন
বাবার
রাজনীতির
পতাকা
বহনের
পাশাপাশি
ব্যবসায়
যুক্ত
রয়েছেন। চার মেয়ের মধ্যে শাহনাজ খাঁন পান্না ব্যাংকার, ইয়াছমিন পারভিন খাঁন কাজল গৃহীনি, ফারহানা সুলতানা খাঁন বিথি সুইডেন প্রবাসী ও ফারজানা সুলতানা খাঁন সিথি ইটালী প্রবাসী।
আব্দুল আজিজ খাঁন তার রাজনৈতিক জীবনে প্রায় ১৪ বছর কারানির্বাসীত
ছিলেন। এর মধ্যে বৃটিশ শাসনামলেই সাড়ে ৪ বছর।
বাকী
সময়টা
পাকিস্তান
আমলে। ৬৯ এর গনঅভ‚্যত্থান কালে সর্বশেষ গ্রেফতার হয়ে ১১দিন জেল খাটেন।
আ’লীগ নেতা আব্দুল আজিজ খাঁনের সাথে আমার পরিচয় হয় ছোটবেলা থেকে অর্থাৎ ৭০’র দশক থেকেই।
আমার
পিতা
অবসরপ্রাপ্ত
সুবেদার
মরহুম
আলী
আকবর
কুমিল্লা
এসপির
অফিসে
চাকরি
করার
সুবাদে
কুমিল্লা
মনোহরপুর
মুনসেফ
বাড়িতে
বসবাস
করতেন। ৩৮ বছরের চাকরি জীবনের ৩৭ বছরই কুমিল্লা শহরে ছিলেন।
তিনি
কর্মজীবনে
সততা
এবং
বিশ্বস্ততার
কারনে
সকলের
নিকট
ছিলেন
সমাদৃত। চাকরিটা করতেন এসপি অফিস, সোনালী ব্যাংক এবং ট্রেজারী অফিস সংশ্লিষ্ট।
বৃহত্তর
কুমিল্লা
জেলার
(কুমিল্লা,
চাঁদপুর
ব্রাক্ষনবাড়িয়া)
বিল
বেতনের
টাকা
আদান
প্রদানে
করতেন। ক্যাশ হাবিলদার আলী আকবর হিসেবেই পরিচিতি ছিলেন।
প্রমোশন
নিতেন
না,
বদলী
হলে
সোনালী
ব্যাংক,
ট্রেজার
অফিস
এবং
এসপি
অফিসের
লোকজনের
সহায়তায়
বদলীর
সুযোগ
পাননি। মুক্তিযুদ্ধকালে
দেবীদ্বার
এলাকার
মুক্তিযোদ্ধা
ও
সরনার্থিদের
ভারত
পারাপার
এবং
মনোহরপুর
এলাকার
হিন্দু
সম্প্রদায়ের
লোকদের
নিরাপত্তা,
তাদের
ফেলে
যাওয়া
সম্পদ
ও
নারীদের
সম্ভ্রম
রক্ষা
এবং
ভারত
পারাপারে
অভ‚তপূর্ব অবদান রেখেছেন।
যা
আজও
ওই
এলাকার
মানুষ
সম্মানের
সাথে
স্মরণ
করেন।
আমার পিতৃকূল- মাতৃকূলে আমার পিতা মরহুম আলী আকবরই একমাত্র আওয়ামীলীগ করতেন।
বাকী
সবাই
ন্যাপের
অনুস্মারী
ছিলেন। অবসরে বা বাজারে গেলে আব্দলূ আজিজ খানের সাথে দেখা করতেন, বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন।
আব্বাকে
খুব
স্নেহ
করতেন,
আব্বাও
খুব
সম্মান
করে
কথা
বলতেন। সে থেকেই আজিজ খানের সাথে আমার পরিচয়।
আব্দুল
আজিজ
খাঁনের
চেহারা
ছিল
খুবই
কালো
বর্নের,
মাথায়
চুল
নেই
বললেই
চলে। দেখতে অনেকটা কালো নিগ্রু সম্প্রদায়ের মানুষ।
খুব
জেদি
এবং
স্পষ্টবাদী। মনের দিক থেকে ছিলেন সাদা মনের মানুষ।
১৯৭৮
সালে
দেবীদ্বার
সুজাত
আলী
কলেজে
লেখাপড়া
করার
সুবাদে
এখানেও
রাজনীতিতে
জড়িয়ে
পড়ি। তখনকার রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় কমরেড আব্দুল হাফেজ, অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ, আব্দুল আজিজ খানের সাথে আমার পরিচয়টা ছিল খুবই গভীরে।
অধ্যাপক
মোজাফ্ফর
আহমেদ
আমাকে
ডাকতেন
বশর
নামে
আর
আব্দুল
আজিজ
খান
ডাকতেন
কমরেড
বলে। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন, আর বলতেন আমি এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করেছি, আমার পিতা ও পরিবারের অধিকাংশ সদস্য কমিউিনিস্ট পার্টি করেছেন।
৪৭শে দেশ বিভাগের পর দেশপুনর্গঠনের
লক্ষ্যে
অনুষ্ঠিত
নির্বাচনে
সোহরাওয়ার্দী
সাহেব
ঢাকা
ও
কলকাতার
দু’টি আসনের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন।
ওই
সময়
দেশ
বিভাগের
মানচিত্র
তৈরীতে
দু’টি পক্ষ তৈরী হয়।
আসাম,
ত্রিপুরা,
কলিকাতা,
বাংলাদেশসহ
একটি
রাষ্ট্র
কায়েমের
দাবী
করেন-
নেতাজী
সুভাস
চন্দ্র
বসু,
সোহরাওয়ার্দী,
মাওলানা
আব্দুল
হামিদ
খান
ভাসানীসহ
আরো
ক’জন প্রভাবশালী রাজনীতিক নেতা।
অপরদিকে
কায়েদ
আজম
মোহাম্মদ
আলী
জিন্নাহ্,
খাজা
নাজিম
উদ্দিন,
মোনায়েম
খান,
ফজলুল
কাদের
চৌধূরী,
একেএম
ফজলুল
হক,
দেবীদ্বারের
মন্ত্রী
মৌলভী
মফিজ
উদ্দিন
আহমেদ,
লিল
মিয়া
উকিল,
আশরাফ
উদ্দিন
চৌধূরী
(রাবেয়া
চৌধূরীর
বাবা)
পাকিস্তান
এবং
বাংলাদেশ
নিয়ে
একটি
রাষ্ট্র
গঠনের
মত
প্রকাশ
করেন। দু’টি মতের বিপরীতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, গণভোটে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, সোহরাওয়ার্দী
ও
ভাসানীদের
পক্ষ
হেরে
যায়। ওই সময় সোহরাওয়ার্দী
ঢাকার
১টি
ও
কলিকাতার
১টি
আসনে
বিজয়ী
হন,
পরে
ঢাকার
আসনটি
ছেড়ে
দিয়ে
খাজা
নাজিম
উদ্দিনকে
সমর্থন
করেন। খাজা নাজিম উদ্দিন বিজয়ী হওয়ার পর তাকে মুখ্য মন্ত্রী করা হয়।
সোহরাওয়ার্দী
সাহেব
নাজিম
উদ্দিনের
সাথে
দেখা
করতে
কলিকাতা
থেকে
বিমান
যোগে
ঢাকা
এয়ারপোর্টে
আসেন। ঢাকা এয়ারপোর্টে নামার পর খাজা নাজিম উদ্দিনের নির্দেশে পুলিশ তাকে বলেন, তিনি এখন আর পাকিস্তানের নাগরিক নন, ভারতের নাগরিক তাই ফিরে যেতে বলেন।
এসময়
বিমান
বন্দরে
উপস্থিত
খাজা
নাজিম
উদ্দিনকে
লক্ষ
করে
হাত
নেড়ে
সোহরাওয়ার্দী
সাহেব
বলেন,
আমি
অচিরেই
পাকিস্তানের
নাগরিক
হয়ে
আসছি। পরে তিনি সদর ঘাটে লঞ্চে করে কলিকাতা চলে যান।
পরে
সোহরাওয়ার্দী
পাকিস্তানের
নাগরিক
হয়ে
ট্রেনে
করে
পূর্ব
পাকিস্তানে
ঢুকেন
চাঁদপুর,
কুমিল্লা
গনসংযোগ
করে
নারায়নগঞ্জ
হয়ে
ঢাকায়
বক্তৃতা
করেন। বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিতে দিতে কুমিল্লায় আসার পর সন্ধ্যা হয়ে যায়, তখন রাত্রিযাপনে গনী মুক্তারের অনুরোধে তার বাসায় রাত্রিযাপন করেন।
এ
ঘটনায়
আব্দুল
আজিজ
খাঁন
ও
তার
বাবা
গনী
মুক্তারকে
১২
দিন
কারা
নির্বাসনে
থাকতে
হয়েছিল। সহরাওয়ার্দী ওই সময়ে ঢাকার সমাবেশ শেষ করার পরপর বিহারী- বাঙ্গালীর রায়ট শুরু হয়ে যায়।
ওই
রায়টের
ঘটনায়
খাজা
নাজিম
উদ্দিনের
মূখ্যমন্ত্রীর
পদ
প্রত্যাহার
করে
সোহরাওয়ার্দীকে
মূখ্যমন্ত্রী
নির্বাচিত
করা
হয়। আজিজ খান ও গনী মুক্তারের প্রতি কৃতজ্ঞস্বরুপ
সোহরাওয়ার্দী
সাহেব
কুমিল্লার
কিছু
সম্পত্তি
আজিজ
খানকে
উপহার
দেন।
পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে ‘হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী
এক
হও’
এ
শ্লোগানের
ফসল-
১৯৫৪
সালের
যুক্ত
ফ্রন্টের
নির্বাচনে
(কমিউনিস্ট
পার্টির
মনোনীত)
দেবীদ্বার’র একাংশ ও মুরাদনগরের একাংশের নির্বাচনী আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ এর পক্ষে কাজ করে তাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করেন।
১৯৬৬
সালের
৬
দফা,
৬৯
সালের
গণ-অভ্যূত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
এসময়
আবু
তাহের
মজুমদারসহ
অনেকের
সাথে
তিনি
কারাবন্দী
হয়েছিলেন,
সকল
রাজনৈতিক
নেতৃবৃন্দের
সাথে
আজিজ
খাঁনও
ছাড়া
পান। তবে জেলগেটে আসার পর অন্য একটি মামলার অজুহাতে আজিজ খাঁনকে আবারো কারাগারে যেতে হয়েছিল।
৬৯’র আন্দোলনের সময় আব্দুল আজিজ খাঁনের পিতা ৮০ বছরের বৃদ্ধ গনী মুক্তারকেও কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
আব্দুল
আজিজ
খাঁন
১৯৭১
সালে
ভারতের
কলকাতার
ত্রিপুরায়
অবস্থান
করে
মুক্তিযোদ্ধাদের
সংগঠিত
করেন।
১৯৭০ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে দেবীদ্বার- মুরাদনগর আসন থেকে তৎকালীন প্রভাবশালী মন্ত্রী মৌলভী মফিজ উদ্দিন আহমেদকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে বিজয় লাভ করেন।
বঙ্গবন্ধুকে
স্বপরিবারে
হত্যার
পর
থেকে
কুমিল্লার
রাজনৈতিক
অঙ্গনে
তিনি
দলের
পক্ষে
বলিষ্ঠ
ভূমিকা
রাখেন। স্বাধীনতা উত্তরকালে আব্দুল আজিজ খান কুমিল্লা উত্তর জেলার প্রথম এডমিনিষ্ট্রেটর
ছিলেন। তাকে ১৯৮০-৮২ সালে বৃহত্তর কুমিল্লা জেলা আ’লীগের সভাপতি ও অধ্যক্ষ আবুল কালাম মজুমদারকে সাধারণ সম্পাদক করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
পরবর্তী
কমিটিতেও
তিনি
আওয়ামী
লীগের
সভাপতি
পদে
দায়িত্ব
পালন
করেন। পরপর ২ বার তিনি বৃহত্তর কুমিল্লার আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগ করেছেন।
রাজনীতির
পাশাপাশি
তিনি
প্রতিষ্ঠিত
পরিবহন
ব্যবসায়ী
ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সংস্থা কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ছিলেন।
এছাড়াও
তিনি
বৃহত্তর
কুমিল্লা
জেলা
বাস
মালিক
সমিতির
দির্ঘদিনের
সভাপতি
ও
কুমিল্লা
মোটর
এসোশিয়েশনের
সাধারন
সম্পাদকের
দায়িত্ব
পালন
করেন,
বরুড়া
আল-
জামিয়াতুল
ইসলামিয়া
দারুল
উলুম
মাদ্রাসার
আমৃত্যু
সভাপতি
ছিলেন। তিনি পূবালী ব্যাংকেরও পরিচালক ছিলেন।
জীবনাবসান:
এই বর্নাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আব্দুল আজিজ খান ১৯৯০ সালের ১৩ অক্টোবর কুমিল্লা ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্টের
সিএমএইচ
এ
শেষ
নিঃশ্বাস
ত্যাগ
করেন।
(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এসব তথ্য বিভিন্ন জনের স্বাক্ষাৎ
ও পত্রিকা, স্মরণীকা, বই থেকে সংগৃহীত অনুসন্ধানী রিপোর্ট)।
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার,
সাংবাদিক, লেখক, রাজনীতিক ও
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।
০১৭৬১৭৪০২২৭, ০১৮১৯৮৪৪১৮২।
