Tuesday, 14 March 2023

দেবীদ্বারে মাদ্রাসা ও এতিম খানার সভাপতির কান্ড! ভবনে-জনবলে সরকারি খাতায় ‘এতিম নিবাস’- বাস্তবে সবই কাগজে-কলমে-সাইনবোর্ডে!

ভবনে- জনবলে- এতিমে সরকারি খাতায় ‘এতিমখানা’ বাস্তবে সবই কাগজে- কলমে- সাইনবোর্ডে! এমন দৃশ্যের দেখা মিলেছে কুমিল্লা দেবীদ্বার উপজেলার সুবিল ইউনিয়নের ওয়াহেদপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এতিমখানা কমপ্লেক্সে। 

ওয়াহেদপুর গ্রামের আব্দুল জলিল সমাজ সেবা কর্মকর্তার বরাবরে এক লিখিত অভিযোগ জানান, ‘ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা’ ও ‘ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এতিমখানা কমপ্লেক্স’ এর পরিচালনা পর্ষদ’র সভাপতি কাজী শাহ আলমের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনীয়ম, দূর্নীতি, সেচ্চাচারীতা, অর্থ আত্মসাতের ফিরিস্তি রয়েছে। মাদ্রাসার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত দ্বিতলের একটি ভবনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে এতিমখানার নামে ভুঁয়া দলিল সম্পাদনে এতিমদের নামে সরকারি অর্থ বরাদ্ধ এনে আত্মসাৎ করার অভিযোগ করেন।

অভিযোগকারী আব্দুল জলিল বলেন, এতিম খানা নির্মানে নিজস্ব ১০ শতাংশ জমি ও নির্দিষ্ট সংখ্যক এতিম, আবাসন ও পাঠদানের ভবন, বাবুর্চিখানা, শিক্ষকসহ জনবল থাকতে হয়। কাগজে কলমে এসবের কোন ঘাটতি নেই। 

কাজী মাহাবুল মিয়া বলেন.- মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি কাজী শাহ আলম একচ্ছত্র আধিপত্ত বিস্তারে এবং অজ্ঞাত খুটির বলে ভ‚ঁয়া দলিলে মাদ্রাসার সম্পত্তি এতিম খানার নামে দেখিয়ে এসকল অনৈতিক কাজগুলো সম্পাদন করে আসছেন। তিনি মাদ্রাসা ও এতিমের টাকায়- এতিমখানা, মসজিদ, মাদ্রাসার বিভিন্ন ভবন এবং মূল গেইটসহ অন্তত: এক ডজন সাইন বোর্ড ও ভিত্তি প্রস্তরে কাজী শাহ আলমের নাম লিখিয়েছেন। 

সরেজমিনে ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায় যেয়ে দেখা যায়- মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের দক্ষিণ-পশ্চিম কোনায় এতিম খানার ৮ কক্ষ বিশিষ্ট দ্বিতল ভবনে অফিস কক্ষ, শ্রেণী কক্ষ, শোবার ঘর, ডায়েনিং কক্ষ, বাবুচ্চিখানা সবই আছে, এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতির জন্য নিজস্ব কক্ষও আছে। ওই কক্ষে সভাপতি কাজী শাহআলম ও স্থানীয় সংসদ সদস্য রাজী মোহাম্মদ ফখরুল (এমপি)’র নামে খোদাই করা দু’টি আলীশান চেয়ারও রয়েছে। ওই ভবনটির গায়ে সাইনবোর্ডে ‘ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এতিমখানা কমপ্লেক্স’ লিখা আছে। এতিমখানাটি স্থাপিত ২০১৭ সালে, রেজিঃ নং-কুমি ২১২৬/২০১৯ইং। 

এতিমখানা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি কাজী শাহ আলম সমাজ সেবা অধিদপ্তরে এতিম খানার ৪ সদস্যের যে জনবল দেখিয়েছেন- তাতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে সভাপতির নাতী ডাচ বাংলা এজেন্ট ব্যাংকের ওয়াহেদপুর বাজার শাখার এজেন্ট কাজী হাসবি, সহকারী শিক্ষক হিসেবে মাদ্রাসা মসজিদের মোয়াজ্জিন হাফেজ আব্দুর রহমান ও সভাপতির নিজ কণ্যা ওয়াহেদপুর মাদ্রাসার অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারি মারিয়া আক্তার এবং বাবুর্চি হিসেবে সভাপতির ভাতিজা ঢাকায় একটি প্রাইভেট কোম্পানীর পিকাপ ভ্যান চালক আল আমিনকে নিয়োগ দেখিয়েছেন। এদের নাম কাগজে কলমে বা সমাজসেবা কার্যালয়ে থাকলেও বাস্তবে তাদের কারোরই এতিম খানার সাথে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি।

তালিকাভ‚ক্ত ২০জন এতিমের মধ্যে সরকারী ভাতাপ্রাপ্ত ৩ জন এতিম রয়েছে। এতিমখানার ভবনে যেয়ে দেখা যায়, ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার দ্বিতীয় এবং তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের দু’টি শ্রেণী কক্ষে ক্লাশ চলছে। ওদের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণীর ৪ শিক্ষার্থী এতিমখানার তালিকাভ‚ক্ত এতিম পরিচয়ে আরমান হোসেন রাব্বী জানায় তার বাবা কামাল হোসেন দুবাই প্রবাসী, মীর হোসেনের পুত্র সাজ্জাদ হোসেন ও জাকির হোসেনের পুত্র রিশাদ জানায় তাদের বাবা মালদ্বীপ প্রবাসী, কাজী লোকমান হোসেনের পুত্র কাজী ইয়ামিন জানান তার বাবা চট্রগ্রামে সিএনজি চালান। এদের সবারই পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়- স্বজন আছে। তার পরও এরা এতিম, তবে এরা কেহই সরকারি ভাতাপ্রাপ্ত এতিমের তালিকায় নেই বলেও জানায়। 

সরকারি ভাতা প্রাপ্ত এতিম ওয়াহেদপুর গ্রামের আদিল ইসলাম, সৈকত হোসেন, হাসিবুল ইসলামসহ ৩ এতিমেরও দেখা মিলেনি এতিম খানা ও মাদ্রাসায়। এ ৩ এতিমের মাদ্রার সহপাঠিরা জানায়, ওরা কেউ মাদ্রাসায় বা মক্তবে পড়তে আসেনা। 

‘ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা’ পরিচালনা পর্ষদ সদস্য সাখাওয়াত হোসেন ভ‚ঁইয়া বলেন, বাস্তবে এতিম খানার নামে ওই ভবনটি ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার নিজস্ব জমিতে স্থানীয় ইফতেখার আহাম্মদ মাসুদসহ এলাকাবাসী ও মাদ্রাসার নিজস্ব অর্থায়নে ২০১৬-২০১৭ সালে প্রায় ২৫ লক্ষ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। 

সাবেক উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ বশিরুল আলম ভ‚ঁইয়া বলেন, কাজী শাহ আলম নিজেই সরকারী খাস জমি বন্দবস্ত এনে ও দখল করে বসবাস করে আসছেন। নিজের কোন চাকরি, ব্যবসা নেই। উপর্জন বলতে ১৪ বছর মাদ্রাসার সভাপতি ও ৬ বছরের এতিমখানার সভাপতির পদই পূঁজি।

মো. আব্দুল আলীম বলেন, মাদ্রাসার নিয়োগ বানিজ্য, মাদ্রাসার উন্নয়ন কাজে আসা অর্থ, এতিম খানার নামে চাঁদা তুলে বিভিন্ন বিল ভাউচারে অতিরিক্ত খরচ দেখিয়ে তিনি নিজেই ওই টাকায় সংসার চালান। আর যত উন্নয়ন সব কিছুই নিজ টাকায় করেন বলে প্রচার করেন।

‘ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায়’র অধ্যক্ষ মাওলানা মো. সফিকুল ইসলাম বলেন- এতিমখানার কোন নিজস্ব জায়গা নেই। এতিমখানা ও মাদ্রাসার উন্নয়নসহ নানা বিষয়য়ে সভাপতি কাজী শাহ আলম সাহেব ভালো বলতে পারবেন।    

এ ব্যাপারে মাদ্রাসা ও এতিমখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি কাজী মোঃ শাহ আলম বলেন, এতিম খানার জন্য ৩০ বছর আগেই ওয়াহেদপুর গ্রামের লোকনাথ রায় ও সুমন রায় থেকে জমি কেনা আছে। এতিমখানা তার নিজস্ব ভবনেই হয়েছে। ৩ জন এতিমের নামে সরকারি ভাতা বছরে ৭২ হাজার টাকা পাই। এতিমসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মক্তবে পাঠদানকারী ‘ওয়াহেদপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসা’র নৈশ প্রহরী ওসমান গণিকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা করে বেতন দেই। নিয়ম না মেনে এতিম খানা প্রতিষ্ঠা হলে সরকারি বরাদ্ধ পাওয়া যেতনা। এতিম খানার দলিল সমাজ সেবা কার্যালয়ে দেয়া আছে।  

এ ব্যপারে সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ নাছির উদ্দিন বলেন, ভুয়া এতিমখানা বা এতিম খানাকে পূঁজি করে এতিম খানার সভাপতি কাজী শাহ আলম অনীয়ম, দূর্নীতি, সেচ্চাচারীতা, অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে আব্দুল জলিলের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার আগেই আমি এতিমখানাটি পরিদর্শন করেছি। ৩ বার গিয়েছি, প্রতিবারই এতিমখানা বন্ধ পেয়েছি। সাইন বোর্ড থাকলেও এতিম এবং এতিমদের থাকার ঘরও, জনবল দেখতে পাইনি। সভাপতিকে চিঠি দিয়েও পরিদর্শনকালে তাকে উপস্থিত পাইনি। আমি দেবীদ্বারের কর্মস্থলে নতুন এসেছি। এতিমখানাটি সম্পূর্ণ ভুয়া মনে হচ্ছে। এতিমখানার দলিলসহ সমস্ত কাগজপত্র জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ে জমা থাকলেও তা যাচাই করে দেখতে হবে। 


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.