এবিএম আতিকুর রহমান বাশার
উপমহাদেশে প্রগতিশীল রাজনীতিতে আলো ছড়ানো অনন্য ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুজিবনগর বিপ্লবী সরকারের উপদেষ্টা। ১৯৭১-এ ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গঠনের অন্যতম উদ্যোক্তা। কুড়েঘর প্রতীকের রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) সাবেক সভাপতি, প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের আজ (১৪ এপ্রিল) ১০১ তম জন্মবার্ষিকী।
অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের সম্ভ্রান্ত ভূইয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আলহাজ্ব কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। বাবা ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। মোজাফফর আহমদ স্থানীয় হোসেনতলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন ও দেবীদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক এবং ভিক্টোরিয়া কলেজে উচ্চমাধ্যমিক পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি গ্রহণ করেন এবং ইউনেস্কো থেকে ডিপ্লোমা লাভ করেন। বাংলাদেশে সুস্থ্য ধারার রাজনীতির অন্যতম পথিকৃৎ, উপমহাদেশের বাম প্রগতিশীল আন্দোলনের পুরুধা ‘কুড়ের ঘরের ন্যাপ মোজাফফর’ খ্যাত এ রাজনীতিবিদ ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট ৯৭বছর বয়সে রাজধানী ঢাকার একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি, দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গণসংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও ব্যাক্তি উদ্যোগে এ মহান নেতার ১০১তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে তাঁর নিজ গ্রাম এলাহাবাদে প্রতিষ্ঠিত ‘চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশ’র কার্যালয়ের সামনে প্রয়াত নেতার সমাধীতে পূষ্পার্ঘ্য অর্পণ, আলোচনা সভা, মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। অপর দিকে বিকেল ৪ টায় দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবের উদ্যাগে প্রেসক্লাব কার্যালয়ে আলোচনাসভা ও ইফতারের আয়োজন করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতি ছাত্র মোজাফ্ফর আহমেদ দীর্ঘদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেন। সর্বশেষ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। তার রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বর্ণিল। রাজনীতি অঙ্গনে তার শুভসূচনা হয় ১৯৩৭ সালের দিকে। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের (শেরে বাংলা-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী) প্রার্থী হিসেবে নিজের এলাকা কুমিল্লার দেবীদ্বার থেকে প্রভাবশালী মুসলিম লীগ প্রার্থী ও তদকালীন শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ’কে বিপুল ভোটে পরাজিত করে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়ে দেশবাসীকে তাক লাগিয়ে দেন।
স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে তিনি পূনরায় জাতীয় সংসদের সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী বাম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর রংপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এক কাউন্সিল অধিবেশনের পর চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী-এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মাওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের খান আবদুল ওয়াালী খান। মস্কো শিবিরে পূর্ব পাকিস্তানপন্থী ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ অংশ মোজাফফর ন্যাপ নামেও পরিচিত ছিল। তিনি ১৯৬৯-এ আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দানের কারনে গ্রেফতার হন।
আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্তে¡ও ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ’র প্রতিনিধি হিসেবে অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে ১৯৫৮ সালে। তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়। আত্মগোপন থাকা অবস্থায় তিনি আইয়ুব সরকার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সুসংগঠিত করেন। দীর্ঘ আট বছরব্যাপী আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন।
তিনি পার্টির কর্মী, সমর্থক এবং জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার উপরে তিনি অনেক বই ও পুস্তিকাপ্রকাশ করেছেন যেমন “সমাজতন্ত্র কি এবং কেন?” “প্রকৃত গণতন্ত্র তথাসমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা” “অমাকর্সবাদী সমাজতন্ত্র” “কিছু কথা”“মুক্তির পথ” “রাজনৈতিক পরিভাষা”, ‘সমাজতন্ত্রের সৈনিক হইতে হইলে” ইত্যাদি।
জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দেশপ্রেমিক কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার জন্য মদনপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের একমাত্র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র “সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ” সকল প্রগতিশীল মহলের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকার বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিবনগর সরকার ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ এবং সেই ৬ জনের মাঝে। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন এর গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠনে (উনিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা) অধ্যাপক মোজাফ্ফ আহমদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়
১৯৮২সালে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে তিনি কারারুদ্ধ হন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, দক্ষিণ ইয়েমেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের নানান দেশে সফর করেন।
তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে চল্লিশের দশকে যারা ছাত্রাবস্থায় বামপন্থায় দীক্ষা নিয়েছিলেন, মোজাফফর আহমদ তাঁদের একজন। গত শতকের ত্রিশের দশকে মোজাফফর আহমদের ছাত্ররাজনীতিতে প্রবেশ করেন কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থিত ছাত্র ফেডারেশনের হাত ধরে। তিনি ছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কমরেড মোজাফফর আহমদের একনিষ্ঠ অনুসারী। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনকালে তাঁর আজিমপুর কলোনির ৮/আই, নাম্বারের বাসায় নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নিয়মিত বৈঠক করতেন। তৎকালিন কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দদের মধ্যে কমরেড নেপাল নাগ, কমরেড খোকা রায়, কমরেড মনিসিংহ, কমরেড অনিল মুখার্জি, কমরেড সত্যেন সেন অন্যতম। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকা ছিলঅবিস্মরণীয়।
সরকার ২০১৫ সালে অন্যদের সঙ্গে তাকেও স্বাধীনতা পদক দেয়ার ঘোষণা দিলে তিনি সবিনয়ে তা নিতে অস্বীকার করেন। তার মতে ‘রাজনীতির অর্থ দেশসেবা, মানুষের সেবা। পদ বা পদবির জন্য কখনো রাজনীতি করিনি। পদক দিলে বা নিলেই সম্মানিত হয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে আমি বিশ্বাসী নই।’ প্রয়াত এ বাম নেতার ১০১তম জন্ম বার্ষিকীতে জানাই বিপ্লবী লাল সালাম।
%20FILE%20PICTURE%20;-%20PROF-%20MUJAFFAR%20AHMED'R%20101%20BARTH%20DAY-%2013.04.2023%20(2).jpg)