Thursday, 16 March 2023

স্কুল ছাত্রী শ্লীলতা হানি--- দেবীদ্বারে সংঘর্ষের ঘটনায় স্কুলে আসেনি শিক্ষার্থীরা; পৃথক ২ মামলায় ২১১জন আসামী; প্রধান শিক্ষকসহ গ্রেফতার- ১১ এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে

কুমিল্লার দেবীদ্বারে প্রধান শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীর শ্লীলতা হানিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনার পর দিন গ্রেফতার আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা কেউ বিদ্যালয়ে আসেনি। রাতে পুলিশী অভিযানের পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। স্থানীয় মাশিকাড়া বাজারে খুলেনি অধিকাংশ দোকান-পাট। বুধবার রাতে অভিযান চালিয়ে ১০জনকে গ্রেফতার করেছে, এর আগে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক মুক্তল হোসেনকে গ্রেফতার করে। পুলিশের খোয়া যাওয়া শর্টগানটি বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় মাশিকাড়া একটি ঝোপে পরিত্যাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার বিকেলে ২ মামলায় প্রধান শিক্ষকসহ আটক ১১জনকে কুমিল্লা কোর্ট হাজতে চালান করা হয়েছে।

বুধবার মাশিকাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোকতল হোসেন ওই স্কুলের ১০ম শেণীর ছাত্রীকে শ্লীলতা হানীর ঘটনায় ভিক্টিমের বাবা বাদী হয়ে দেবীদ্বার থানায় মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ওই প্রধান শিক্ষককে একমাত্র আসামী করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেছেন। মামলা নং-১৪, তারিখ- ১৫/০৩/২০২৩ইং।

অপর দিকে পুলিশের উপর হামলা, পুলিশের কর্তব্য কাজে বাঁধা দানের ঘটনায় দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক মুক্তার আহমেদ মলি বাদী হয়ে এজহারভ‚ক্ত ১০জন ও অজ্ঞাতনামা ১৫০/২০০ জন সহ ২১০জনকে অভিযুক্ত করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। মামলা নং-১৫, তারিখ- ১৫/০৩/২০২৩ইং।

ছাত্রীর শ্লীলতা হানীর ঘটনায় ভিক্টিমের বাবা বাদী হয়ে প্রধান শিক্ষক মো. মুক্তল হোসেনকে একমাত্র আসামী করে দেবীদ্বার থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা কটরলে পুলিশ বৃহস্পতিবার বিকালে প্রধান শিক্ষক মো. মোকতল হোসেনকে কোর্টে প্রেরণ করে। এছাড়া পুলিশের উপর হামলা, পুলিশের কর্তব্য কাজে বাঁধা দানের ঘটনায় দেবীদ্বার থানার উপ-পরিদর্শক মুক্তার আহমেদ মলি বাদী হয়ে এজহারভূক্ত ১০জন ও অজ্ঞাতনামা ১৫০/২০০ জন সহ ২১০জনকে অভিযুক্ত করে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। ওই ঘটনায় আটক উপজেলার শাকতলা গ্রামের ডাঃ বশির আহাম্মেদ ভূইয়ার পুত্র লুৎফুর কবির ভূইয়া সোহাগ (৩১), আবুল কালাম আজাদ ভূইয়ার পুত্র মনিরুজ্জামান ভূইয়া প্রকাশ জামান ডাক্তার (৪৮), মোখলেছুর রহমানের পুত্র আলী আশ্রাফ (৪৭), মৃত শরবত আলীর পুত্র মোঃ ছবুর (১৯), মাশিকাড়া গ্রামের মোঃ সেলিমের পুত্র শাহ পরান (৩০), মৃত মুসলিম উদ্দিনের পুত্র মোঃ ওয়াজকুরুনী (৩৫), হামলা বাড়ীর মৃত আব্দুল হাকিমের পুত্র মোঃ জাহাঙ্গীর আলম (৫০), পদ্মকোট গ্রামের মৃত জব্বার আলীর পুত্র মোঃ ইউনুছ (৩৬), আবুল কাশেম এর পুত্র মোঃ জিয়াউর রহমান (৩২), হোসেনপুর গ্রামের মৃত আকরম আলীর পুত্র আব্দুল কাদের (৫৫)কেও কোর্টে প্রেরণ করা হয়।

বৃহস্পতিবার সকালে সরোজমিনে ঘটনাস্থল মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হাজী মোঃ বাহালুল হক, সহকারি শিক্ষক/ শিক্ষিকাসহ পরিচালনা সদস্যরা বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকলেও শিক্ষার্থী শুণ্য পুরা বিদ্যালয়। পাশ^বর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক থাকলেও হাতেগুনা কয়েকজন শিক্ষার্থী ছিল। বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা ভাংচুর করে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করা হয়। 

মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি হাজী মোঃ বাহালুল হক জানান, আজকে বিদ্যালয় খোলা থাকলেও গতকালের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা কেই বিদ্যালয়ে আসে নাই। 

একাধিক শিক্ষক ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য জানান, এর আগে প্রধান শিক্ষক শিক্ষক মো. মুক্তল হোসেন তিতাস উপজেলার দুলারামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরিক্ষার্থী (ছাত্রীকে) যৌন হয়রানীর অভিযোগে ওই স্কুলে জুতার মালা পড়িয়ে বিদায় দেয়া হয়, সর্বশেষ দেবীদ্বার উপজেলা মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে আবেদন করলে স্থানীয়রা এ লম্পট শিক্ষকের বিরুদ্ধে মানব বন্ধন করে। পরে রাজনৈতিক প্রভাবে এবং ৩০০ টাকার নন জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে তার বিরুদ্ধে নারী ক্যালেঙ্কারী এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ পেলেই তাৎক্ষনিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ ও স্কুল থেকে অব্যাহতি পাওয়ার  শর্তে তাকে নিয়োগ দেয়া হয় এবং স্কুল থেকে নিজ বাড়ি এক কিলোমিটার দূর হলেও তার পরিবারসহ ক্যাম্পাস সংলগ্নে বাসা ভাড়া করে দেয়া হয়। 

দশম শ্রেনীর একছাত্রীকে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোকতল হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনায় বুধবার দুপুরে প্রধান শিক্ষকের সমর্থকদের উপর হামলা- মারধরের ঘটনায় অন্ত:ত ২০/৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। ওই ঘটনার রেস ধরে  শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর যোগদানে বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পুলিশ- ছাত্র- জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষে সংঘর্ষে ৭ পুলিশ সদস্যসহ অন্ত:ত অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

তার ব্যবহৃত মোটর সাইকেল ও তার মেয়ের জামাইর আরেকটি মোটর সাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। ওই সময় পুলিশের রাবার বুলেট ও সর্টগানের গুলিতে ১৫ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী গুলি বিদ্ধসহ প্রায় ৫০জন আহত হয়। এছাড়াও দেবীদ্বার থানার ওসিসহ ৭ পুলিশ আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।

উল্লেখ্য, বুধবার (১৫ মার্চ) সকালে অনুমান পোনে ৯টায় প্রথমে প্রধান শিক্ষক তার কক্ষে দশম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে ডেকে নিয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেয় এবং দ্বিতীয় দফায় সকাল পোনে ১০টায় প্রতিষ্ঠানের একটি শ্রেণী কক্ষে তিনি একই ঘটনা করে। ওই ঘটনার পর ছাত্রীর সহপাঠিরাসহ তাকে নিয়ে বাড়ি যেয়ে তার বাবার কাছে ঘটনা বর্ণনা দেয়। 

বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যৌন হয়রানীর অভিযোগে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার মাশিকাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মোকতল হোসেনকে অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনায় বুধবার দুপুরে প্রধান শিক্ষকের সমর্থকদের উপর হামলা- মারধরের ঘটনায় অন্ত:ত ১০/১২ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। ওই ঘটনার রেস ধরে  শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবক ও এলাকাবাসীর যোগদানে বিকেল থেকে রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত পুলিশ- ছাত্র- জনতার দফায় দফায় সংঘর্ষে সংঘর্ষে দেবীদ্বার থানার ওসিসহ ৭ পুলিশ সদস্যসহ অন্ত:ত অর্ধশতাধিক আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান মো. হুমায়ুন কবির, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিসহ সঅন্যান্য সদস্য, শিক্ষক ও এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগীতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে চেষ্টা করে পারেনি। বিক্ষুব্ধ জনতা প্রধান শিক্ষককে স্কুল মাঠে এনে বিচারের দাবী জানায়। এসময় পুলিশের উপস্থিতিতে বিদ্যালয়ের দরজা-জানালা এবং প্রধান ফটক ভাংচুরের চেষ্টা করে। 

প্রধান শিক্ষককে রক্ষায় তারপক্ষে বহিরাগত কিছু লোকজন এসে ছাত্রদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। এ হামলায় অন্তত ৮-১০জন শিক্ষার্থী আহত হয়। আহত, নাঈম খন্দকার, মো. নাঈম ও জিহাদুল ইসলাম জানায় প্রধান শিক্ষকের ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে শিক্ষার্থীদের উপর হামলা চালায়। আহত শিক্ষার্থীদের দেবিদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। আহতরা সবাই ওই বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেনীর ছাত্র। ছাত্রদের উপর হামলার পর পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠে। পরে তাঁকে প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করে ছাত্র, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। অবরুদ্ধ প্রধান শিক্ষক দেবিদ্বার উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করছেন।

সংবাদ পেয়ে বুধবার বিকেলে দেবীদ্বার সার্কেল এএসপি আমিরুল্লাহ ও দেবীদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ কমল কৃষ্ণ ধরের নেতুত্বে একদল পুলিশ ঘটনাস্থলে যেয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনার চেষ্টা চালায়। এসময় পুলিশও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং রাতে স্কুল ক্যাম্পাসের সমস্থ বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ রাবার বুলেট ও সর্টগানের গুলি ছুড়লে এতে অন্তত: ১৫জন গুলিবিদ্ধ হয়, গুলিবিদ্ধ মারাত্মক আহত ৮জনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থান্তরিত করা হয়। অপরদিকে বিক্ষুব্ধ জনতা চকলেট বোমা বিস্ফোরনে এলাকা আতঙ্কতি করে তোলে এবং বিদ্যালয়ের দরজা জানালা ভাংচুর করে।

রাত পৌনে ৯টায় কুমিল্লা পুলিশ সুপার আব্দুল মান্নান ও দেবীদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডেজী চক্রবর্তী বিপুল সংখ্য আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে প্রধান শিক্ষকসহ পুলিশ সদস্যদের উদ্ধার করে আনার পথে বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া করে। এসময় ডিবি পুলিশসহ ৩ পুলিশকে আটক করে মারধর করে এবং এক পুলিশ সদস্যকে আটক করে রাখেল রাত সাড়ে ৯টায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ তাকে উদ্ধারে এলাকায় অভিযান চালায়। ওই সময় রাত ১০ পর্যন্ত এলাকাবাসীর সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। 

এদিকে রাতে পুলিশের রাবার বুলেট ও সর্টগানের গুলিতে আরো অন্তত ১৫-২০ জন গুলিবিদ্ধ হয়। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহতরা হলেন, সিয়াম (১৫), মিনহাজ (১৭), অলি (১৬), আকাশ (১৬) আরিফুল ইসলাম (২৬), সাব্বির (১৮) ও হৃদয় (১৭)। এদের প্রত্যেকেকে দেবীদ্বার উপজেলা স্বাস্থ্য বমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পেরণ করা হয়েছে। এছাড়াও পুলিশ সদস্য জহিরুল ইসলাম ও সারোয়ারসহ ৫ পুলিশ আহত হয়েছে বলে জানা যায়।

এ ব্যাপারে দেবীদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ কমল কৃষ্ণ ধর জানান, কি পরিমান শটগানের শিষা, রাবার বুলেট, গ্যাসগান ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছে তা গুনে বলতে হবে। তবে শ্লীলতা হানীর ঘটনায় ভিক্টিমের বাবা বাদী হয়ে মামলা করেছেন এবং পুলিশের কর্তব্য কাজে বাঁধাদান এবং পুলিশের অন্ত্র ছিনতাইয়ের ঘটনায় পৃথক দু’টি মামলা হয়। উভয় মামলায় আটক অভিযুক্তদের বৃহস্পতিবার বিকেলে কোর্ট হাজতে চালান করা হয়েছে। 



শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.