Saturday, 12 November 2022

দালাল আইনের আসামির মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল: মুক্তিযোদ্ধা কোটায় দুই সন্তানের সরকারি চাকরি এখনো বহাল!

 


মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে করা মামলায় আসামি ছিলেন, গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছেন। এলাকায় রাজাকার হিসেবে পরিচিত। তবু তিনি সনদধারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মোহাম্মদ জব্বার আলী ওরফে রুক্কু মিয়া মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা নিয়েছেন। তাঁর দুই সন্তান মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশ বাহিনি ও ব্যাংকে এখনো চাকুরী করছেন।

এমন অভিযোগের বিষয়ে আপিলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রমানীত না হওয়ায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের (জামুকা) ৩৯তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মোহাম্মদ জব্বার আলী ওরফে রুক্কু মিয়ার লাল মুক্তিবার্তা- গেজেট বাতিল করে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর গেজেট অধিশাখার (৪৮.০০.০০০০.০০৪.৩৭.০০২.২২. ১৮১১ নং স্মারকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। একই সাথে একজন যুদ্ধাপরাধি কিভাবে  মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেল তা খতিয়ে উক্ত কাজের সাথে যুক্ত অপরাধীদের আইনের আওতয় আনতে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়।

প্রতারনার মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধী মামলায় বাবা জেল খাটার পরও মিথ্যা তথ্য দিয়ে বাবার নামে মুক্তিযোদ্ধা সনদ বানিয়ে সরকারি চাকুরী করছেন দুই ভাই। তাদের বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হবার পরও তারা এখনো চাকুরীতে রয়েছেন বহাল তবিয়তেই। চাকরিরত ওই দুই ভাই ঢাকা র‌্যাব-১ সিপিসি-২ এর ডিএডি পদে কর্মরত মোহাম্মদ জামাল হোসেন ও অগ্রনী ব্যাংক কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা রুপবাবু বাজার শাখর দ্বিতীয় কর্মকর্তা মো. মহসীন মিয়া। এরা দু‘জনেই সম্প্রতি বাতিল হওয়া মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ জব্বার আলী ওরফে রুক্কু মিয়ার ছেলে।

জানাযায়, কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার দারোরা ইউনিয়নের পদুয়া গ্রামের বাসিন্দা জব্বার আলী মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেয়েছেন ২০০৯ সালে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ প্রকাশিত স্মরণিকা লাল মুক্তিবার্তায় নাম ছিল জব্বার আলীর। তার লাল মুক্তিবার্তার (নম্বর ০২০৪০৮০৬৯৩ )। তবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, দালাল আইনে যাঁর নামে মামলা ছিল, তাঁকে কোন বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধা সনদ দেওয়া হলো? কারা এ সনদ নিয়ে দিল? লাল মুক্তিবার্তায় নাম ওঠানোও সহজ কথা নয়।

মুরাদনগরের স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা বলেছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন জব্বার আলী। ১৯৭২ সালের ১৪ এপ্রিল মুরাদনগর থানায় তাঁর বিরুদ্ধে দালাল আইনে মামলা হয়। মামলা নম্বর- ১২৭, জিআর ২৭৪/১২। এ মামলায় তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। মামলা চলার সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর সাধারণ ক্ষমা পান। জব্বার আলীর মোহাম্মদ জামাল হোসেন নামে এক ছেলে গত ১৯৯৯ সালের ২৭ অক্টোবর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পুলিশে চাকরি পেয়ে বর্তমানে পদোন্নতি নিয়ে ঢাকা র‌্যাব-১ সিপিসি-২ এর ডিএডি পদে কর্মরত রয়েছেন। তার আরেক ছেলে ২০১৩ সালে ৩৪তম বিসিএস পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরির জন্য প্রশাসনিক ক্যাডারে মনোনীত হয়ে পরে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধাদের অভিযোগ ও বাধার কারনে সেখানে যোগদান না করলেও এখন এ সনদেই একটি ব্যাংকে দ্বিতীয় কর্মকর্তার পদে চাকুরী করছেন। 

শনিবার দুপুরে দেবীদ্বার উপজেলা প্রেসক্লাবে এসে মুরাদনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নির্বাহী সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আলী সরকার ও দারোরা ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার আবদুল করিম মোল্লা বলেন, জব্বার আলীর মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রাপ্তি অর্থের বিনিময়ে হয়ে থাকতে পারে। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগের মুখে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বন্ধ করে দেয় মন্ত্রণালয়। এরপর আমাদের অভিযোগের পর তার মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধা কোটায় তার দুই সন্তাকে চাকুরী হতে অব্যাহতি দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছি।

যোগাযোগ করা হলে জব্বার আলীর পরিবারের পক্ষ থেকে ঢাকা র‌্যাব-১, সিপিসি-২ এর  ডিএডি মোহাম্মদ জামাল হোসেনের সাথে সেল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি শনিবার (১২ নভেম্বর) দুপুরে জানান, আমার পিতার বিরুদ্ধে দালাল আইনে মামলা এবং তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা দু’টোই সত্য। গত ৩০/০৪/১৯৭২ সালে মারামারির অভিযোগে আমার বাবার বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছিল, যেটি দালাল আইনের মামলা হিসেবে প্রচার করা হয়। পরবর্তীতে ওই মামলাটি বঙ্গবন্ধুর সাধারন ক্ষমা ঘোষণায় বাতিল হয়। আমার বাববাবা একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথেষ্ঠ প্রমান থাকার পরও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আ,ক,ম মোজাম্মেল হক(এমপি) সরাসরি সাক্ষাতের জন্য ডেকে নিয়েও কোন সাক্ষাত গ্রহন না করে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয় এক গ্যাজেট বিজ্ঞপ্তিতে আমার বাবার মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল করে দেয়।

বাতিল হওয়া ওই গ্যাজেটের বিরুদ্ধে আমি বাদী হয়ে ঢাকা বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ এক নম্বর আদালতে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, উপ-সচিব, জামুকার মহাপরিচালক, কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার, মুরাদনগর’র ইউএনও, কুমিল্লা জেলা ও মুরাদনগর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে ৫ কোটি টাকা ক্ষতিপুরন দাবী করে একটি মামলা দায়ের করি। যা আদালতে বিচারাধীন। উল্লেখ্য গত ২০১৭ সালের ১৫ জুন তাদের বাবা মোহাম্মদ জব্বার আলী ওরফে রুক্কু মিয়া মারা যান।

তিনি আরো বলেন, তার বাবা একজন প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথেষ্ঠ প্রমানও রয়েছে,- যুদ্ধকালিন সর্বাধিনায়ক মুহাম্মদ আতাউলগণি ওসমানীর স্বাক্ষরিত সনদ, মুজিব বাহিনীর আঞ্চলিক অধিনানায়ক শেখ ফজলুর হক মনি স্বাক্ষরিত সনদ, বঙ্গবন্ধু কর্তৃক (১৫/০৭/১৯৭২ইং) গৌরবের স্বীকৃতি স্বরুপ (চেক নং ভিএমই-৪৬৭৮২০) ২০০০ টাকা প্রাপ্তি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রনালয় কর্তৃক প্রকাশিত গেজেট নং- ১৪১৫৬৭, তারিখ- ১৮/০৪/২০১৬ইং, মুক্তিবার্তা (লাল) নং- বই নং- ০২০৪০৮০৬৯৩, সাময়িক সনদ নং- ম-১৪১৫৬৭, তারিখ- ১২/১১/২০০৯ইং। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্বাক্ষরিত (জামুকা) সনদ নং- ২৩৮৮৩, তারিখ- ২০/০৪/২০০০ইংএবং বাদীর জীবীকার তাগিদে নিয়মিত সম্মানী ভাতাও গ্রহন কে আসছেন।

Read More

দেবীদ্বারে ক্ষেতমজুর সমিতির ১০ দফা দাবী বাস্তবায়নে মানববন্ধন সমাবেশ বিক্ষোভ মিছিল




শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.