দেবীদ্বারে এবার ১৬ বছর জঙ্গলবাসী মুজিবরের পর নির্জন বাঁশঝারের খুপরিতে
শিকলবন্ধী আগুনে পোড়া ক্ষত-বিক্ষত পঁচা শরীর নিয়ে ৮দিন ধরে ইউনুছ মৃত্যুর প্রহর গুনছে
এবিএম আতিকুর রহমান বাশার
জঙ্গলে ১৬ বছর খুপরিতে বসবাস করার পর হাসপাতালে ঠাঁই নেয়া আলোচিত চিরকুমার মুজিবর(৬০)’র ঘটনার পর এবার শিকলবন্ধী ক্ষত বিক্ষত শরির নিয়ে বাঁশ ঝারের নির্জন খুপরিতে মানবেতর জীবনযাপনকারী ইউনুছ মিয়া(৫৩) নামে আরো এক ব্যক্তির সন্ধ্যান মিলেছে।
শুক্রবার (২ জুন) দুপুরে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ৬ নং ফতেহাবাদ ইউনিয়নের সুলতানপুর গ্রামের লুতু ভূঁইয়া কমপ্লেক্সের পাশে আলম মিয়ার বাড়ির নির্জন বাঁশঝারের ভেতরে ওই মর্মান্তিক ও অমানবিক দৃশ্যের দেখা মিলে।
ওখানে যেয়ে দেখা যায় ৫ ফুট প্রশস্ত ও ৫ ফুট দৈর্ঘ এবং ৫ ফুট উচ্চতায় একটি ছাপড়া, তার উপরে টিনের ছাউনি, এক পাশে প্লাষ্টি বস্তার বেড়া ৩ পাশ খোলা এবং মশারী টানানো একটি খুপরি। ভেতরে বসে আছেন ইউনুছ মিয়া(৫৩) নামে এক ব্যক্তি। মশা-মাছি দূর্গন্ধযুক্ত পরিবেশ। মশারী উঠিয়ে দেখা যায় পাশের একটি গাছের সাথে পায়ে একটি শিকল বেঁধে তালাবন্ধী করে রাখা হয়েছে ইউনুছকে। ডান হাতের আঙ্গুলে পঁচন ধরেছে, দু’হাতই ভাঙ্গা। পরনের কাপড়গুলো গত শীতে শরীরে জড়ানো, ময়লায় কাপড়ের রং পাল্টে গেছে।
নাম জিজ্ঞেস করাতেই বললেন, আমাকে কিছু টাকা দেন, কিছু কিনে খাব। সে জানায় তার নাম ইউনুছ মিয়া, বাবার নাম মৃত: মুক্তল হোসেন। হাতের আঙ্গুলে পচন ধরল কিভাবে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাকে পুড়িয়ে মারতে আমার মেঝো ভাইয়ের স্ত্রী সেলিনা বেগম আগুনে পুড়িয়েছে। সে আমার দু’টি হাত ভেঙ্গে দিয়েছে। আমার মেঝো ভাই কবির আহমেদ ও তার ছেলেরা আমাকে গত শুক্রবার (২৭ মে) এ নির্জন জায়গার বাঁশঝারে খুপড়ি বানিয়ে রেখে যায়। আমি যাতে পালিয়ে যেতে না পারি তার জন্য পায়ে শিকল লাগিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে। আমাকে খাওন দেয়না, চিকিৎসা করায়না। তাদের ভয়ে আমাকে কেউ সাহায্য করতেও আসেনা। আমাকে বাঁচান।
এ বিষয়ে স্থানীয়রা কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। নাম প্রকাশে এক প্রবাসী এসে জানালেন, রাতের আঁধারে চুরি করে স্থানীয় স্কুলে দশম শ্রেণীতে পড়ুয়া তার এক ছেলের মাধ্যমে খাবার দিয়ে যায়। দূর্গন্ধে কাছে থাকা যায়না। তাই কেউ তাকে খাওয়ায়ে দিতে আসেনা। ডান হাতের আঙ্গুল পুড়ে যাওয়ায় একটি আঙ্গুল পঁচন ধরেছে। নিজ হাতে খেতে কষ্ট হয়, বাম হাতও নাকি ভাঙ্গা। খেতে না পারলে ২/৪ দিনের মধ্যে মরে যাবে। এ অবস্থায় তার চিকিৎসা, খাদ্য ও পরিচর্যা দরকার।
তবে অভিযুক্ত মেঝো ভাই কবির আহাম্মদ জানালেন, তার ভাই দির্ঘদিন মানুষিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় আছে। ঘরে পায়খানা প্রশ্রাব করে, ঘর থেকে বেড়–তে পারলে পাশের মার্কেট থেকে গাঁজা কিনে এনে সেবন করে। তাকে আলাদা একটি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। ওই ঘরে প্রায়ই আগুন ধরিয়ে দেয়। এ পর্যন্ত ১২ বার আগুন লাগিয়েছে। গত শুক্রবারও ঘরে আগুন দেয়। তাই তাকে আপাতত বাঁশ ঝারে একি বাছাইর (ঘর) বানিয়ে রেখেছি। পোড়া ঘর মেরামত করে আবারো ওই ঘরে নিয়ে আসব। চিকিৎসার ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি জানান, চেষ্টা করেছি হাসপাতালে নিতে পারিনাই, তাই পাশ^বর্তী এক মহিলা কবিরাজের মাধ্যমে চিকিৎসা করাচ্ছি।
স্থানীয়রা আরো জানান, গত ৮দিন ধরে এ অবস্থায় তাকে দেখে আসছি। ওই পরিবারটি খুবই প্রভাবশালী, তাই হামলা- আক্রমনের ভয়ে আমরা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে সাহস পাইনি। ইউনুছ মিয়া প্রায় ১৮/২০ বছর পূর্বে বিয়ে করেছিলেন, সংসার হয়নি। আর বিয়েও করেনি। মেঝো ভাই কবির আহমেদের সাথে থাকতেন। তার সম্পত্তিগুলোও নিজ নামে লিখিয়ে নিয়েছেন। কতটা নিষ্ঠুর হলে আপন ভাইয়ের সাথে এমন আচরন করতে পারে। খাদ্য, চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় ধিরে ধিরে মৃত্যুর কোঠে ঠেলে দিতে পারে।
অপর অভিযুক্ত কবির আহমেদের স্ত্রী সেলিনা বেগম জানান, আমার দেবর নিজেই নিজের ঘরে আগুন দিয়েছে, হাত পুড়েছে, পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গেছে। এখন দোষ দেয় আমাকে। এটা সত্যিনা।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি মেম্বার বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাঃ মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি আজ (২ জুন) শুক্রবার সকালে ওই বাড়িতে যেয়ে এ অমানবিক দৃশ্য দেখে সবাইকে ডেকে এনে তাদের বলে দিয়েছি। তার চিকিৎসা, পরিচর্যা জরুরী। তাকে পুকুর পাড়ের জঙ্গল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসতে বলেছি।