কুমিল্লায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে চোর ও ডাকাত সন্দেহে ৩টি পৃথক ঘটনায় ৪জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১টি ডাকাতি ও ২টি চুরির অভিযোগ রয়েছে। ৩টি ঘটনার মধ্যে ১টি ঘটনাও গণপিটুনি নয় বলেও দাবী করছেন এলাকাবাসী। এসব ঘটনায় জেলা জুড়ে আতংক সৃষ্টির পাশাপাশি বিচার বহির্ভ‚ত হত্যা বলে দাবী করছেন মানবাধিক কর্মীরা। আইন হাতে তুলে না নিতে জনগণের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছেন জেলা পুলিশ। ওই ৩ ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হলেও ১টি ঘটনায় মামলা হলেও ২টি ঘটনার মামলা ঝুলে আছে।
নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ অতিক্রম করতে না করতেই এসব ঘটনা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। গত ৮ জানুয়ারী কুমিল্লার চান্দিনায় চোর সন্দেহে ১জনকে পিটিয়ে হত্যার পর ১২ জানুয়ারী জেলার মুরাদনগরে মাইকে ডাকাতের গুজব প্রচার করে ২জন এবং একই রাতে চান্দিনা ও দেবীদ্বার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় চুরির অভিযোগে একজনকে পিটিয়ে আহতের পর ১৪ জানুয়ারী সকালে মৃত্যু ঘটে তার।
জানা যায়, বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারী) ভোরে চান্দিনা ও দেবীদ্বার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় গোডাউন থেকে কাগজের কার্টুন চুরির অভিযোগ এনে আশিকুর রহমান (১৯) নামে এক যুববকে গণপিটুনি দেয় এলাকাবাসী। পুলিশের ভয়ে ওই যুবক হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছিল। ১৪ জানুয়ারী ভোরে তার অবস্থার অবনতি ঘটলে চান্দিনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত আশিকুর রহমান কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরের মহারং এলাকার বাবুর্চি মিজানুর রহমানের ছেলে। পেশায় রিক্সা চালক হলেও এলাকায় ছিচকে চোর হিসেবে চিহ্নিত। এক ভাই এক বোনের মধ্যে আশিক বড়। ১৯ বছর বয়সী আশিকের দাম্পত্য জীবনে দেড় বছর বয়সী ফুটফুটে একটি ছেলে সন্তানও রয়েছে। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে বাকরূদ্ধ হয়ে পড়েছে তার বাবা-মা। আশিকের মরদেহ থানায় আনার পর দাদা-দাদীর সাথে থানায় আসে ছোট্ট এই শিশুটি। পরিবারের সকলের চোখে পানি ঝড়লেও সে দিব্যি আপন মনে হেসে খেলে যাচ্ছে। পিতৃহারা এই শিশু কখনও ‘বাবা’ বলে ডাকতে পারবে না তাকে।
সামান্য কাগজের কার্টুন চুরির অভিযোগে এমন নির্মম আঘাত করাকে স্বাভাবিক ভাবে মেনে নিতে পারছে না কেউ।
গত (১২ জানুয়ারী) বৃহস্পতিবার রাত ১২টার দিকে কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯নং দারোরা ইউনিয়নের পালাসুতা গ্রামে ডাকাত সন্দেহে মাইকে ঘোষনা দিয়ে তিন যুবককে আটক করে গণপিটুনি দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই দুই যুবক শ্যালক দুলাভাইয়ের মৃত্যু ঘটে।
নিহতরা হলেন ১৯ নং দারোরা ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের কাজিয়াতল গ্রামের পূর্ব পাড়ার সালাম মিয়ার ছেলে নুর আলম (৩৫) ও একই ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের পালাসুতা গ্রামের গিয়াস উদ্দিনের ছেলে ইসমাইল হোসেন (৩০)। তারা সম্পর্কে একে অপরের শ্যালক-দুলাভাই। এ ঘটনায় কুমিল্লা মহানগরীর ২৪নং ওয়ার্ডের কোটবাড়ী বাঘমারা এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে শাহজাহান (৩২) নামে আরো একজন গুরুতর আহত অবস্থায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তবে নিহতের পরিবারের দাবী বৃহস্পতিবার নুরে আলম কুমিল্লা থেকে বন্ধু শাহজাহানকে সাথে নিয়ে তার শ্বশুরালয়ে যান। এসময় তার শ্বশুর বাড়ির চাচাতো শ্যালক ইসমাইলও সাথে ছিল। এসময় হঠাৎ মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাদেরকে ডাকাত বলে গণপিটুনি দেয়। তবে এলাকার কিছু লোকের দাবী তারা খারাপ প্রকৃতির লোক ছিলেন।
এর আগে গত ৮ জানুয়ারী ভোরে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার কেরণখাল ইউনিয়নের সাতবাড়িয়া গ্রামে একটি মুদি দোকানে চুরির অভিযোগে মোজাম্মেল হক সুমন (২৩) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করে এলাকার কয়েকজন যুবক। এসময় ঘটনাস্থলেই সুমন এর মৃত্যু ঘটলে এলাকাবাসী গণপিটুনি বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে।
নিহত মোজাম্মেল হক সুমন পাশ্ববর্তী বাড়েরা ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের রুহুল আমিন এর ছেলে। এ ঘটনায় নিহতের মা মিলি আক্তার বাদী হয়ে চান্দিনা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
নিহতের মা গার্মেন্টস কর্মী মিলি বেগম জানান- আমি স্বামী পরিত্যাক্তা। আমার দুই ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে সুমন বড়। স্বামীর বাড়িতে স্থান না হওয়ায় বাবার বাড়ি বাড়েরা ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামে থেকে স্থানীয় ‘ডেনিম’ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীতে চাকুরী করি। আমার ছেলেটি চট্টগ্রামে থাকতো। মাঝে মাঝে বাড়িতে এসে ২/১ দিন থাকতো।
তিনি কান্না বিজরিত কন্ঠে বলেন, ‘আমার পোলায় যদি চুরি করে থাকতো তাইলে তারা হাত-পা ভাইঙ্গা লুলা কইরাও যদি রাখতো তাও আমি আমার পোলার মুখে মা ডাক হুনতাম’।
এদিকে দোকানে চুরির ভিডিওসহ হাতে গোনা ২/৩জন ব্যক্তি তাকে দুই হাত বেঁধে নির্মম ভাবে পিটিয়ে হত্যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নানা সমালোচনার ঝড় উঠে। এসব ঘটনা আইন বহির্ভ‚ত হত্যাকান্ড বলে দাবী করছেন সচেতন মহল।
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন কেন্দ্রীয় কমিটির ডেপুটি গর্ভনর লুৎফর রেজা খোকন জানান, যে দেশে আইনের শাসন আছে সেই দেশে এমন আইন বহির্ভ‚ত হত্যাকান্ড কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। কিছু হত্যাকান্ডকে গণপিটুনি বলে চালিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর সামিল। আবার গণপিটুনি দিয়ে যাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে এমন প্রতিটি মৃত্যুই অমানবিক। আমরা প্রশাসনকে অনুরোধ করবো যারা এমন ঘটনার সাথে জড়িত তাদেরকে চিহ্নিত করে দ্রæত আইনের আওতায় আনতে। এসব অমানবিক ঘটনার সুষ্ঠু সমাধান না হলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।
এ ব্যাপারে কুমিল্লা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) খন্দকার আশফাজুজ্জামান বিপিএম বলেন- গণপিটুনি দিয়ে হত্যার বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখ জনক। আইন নিজের হাতে না নেওয়ার জন্য আমরা সকলের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি। চোর বা ডাকাত সন্দেহে যাদেরকে আটক করা হয়, দ্রæত স্থানীয় পুলিশ বা পুলিশের জরুরী নম্বর ৯৯৯-এ খবর দিয়ে আমাদের কাছে হস্তান্তর করার জন্য আমরা নিয়মিত কাউন্সিলিংও করে যাচ্ছি।
ডাকাতি বা চুরির ঘটনায় কেউ যেন আতংকিত না হয় সেই পরামর্শ দিয়ে তিনি আরও বলেন, চিহ্নিত চোর ও ডাকাতদের গ্রেফতারে আমাদের জেলা পুলিশ নিরলস ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি দাবি করেন অন্যান্য যে কোন সময়ের তুলনায় কুমিল্লাতে এখনও ডাকাতির ঘটনা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
রোববার (১৫ জানুয়ারী) সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় দেবীদ্বার থানার থানার অফিসার ইনচার্জ কমল কৃষ্ণ ধর জানান, বাগুর হত্যাকান্ডের ঘটনায় নিহত আশিকের পরিবারকে বারবার ডাকার পরও মামলা দায়ের করতে থানায় আসেনি। আজ বিকেলে দেবীদ্বার থানার পুলিশ পাঠিয়েছি চান্দিনা উপজেলার মহারং গ্রামে নিহতের স্বজনদের ডেকে আনতে।
অপরদিকে মুরাদনগর থানার অফিসার ইনচার্জ কামরুজ্জামান তালুকদার জানান, পালাসূতা গ্রামে নিহত দুই পরিবারের কেউ থানায় আসেনি। মামলা করতে আসলে মামলা নেব।
