Saturday, 17 December 2022

দেবীদ্বারে আলো ছড়ানো প্রদীপখ্যাত ক্যাপ্টেন সুজাত আলী


এবিএম আতিকুর রহমান বাশার :

দেবীদ্বারে আলো ছড়ানো প্রদীপখ্যাত ক্যাপ্টেন মো. সুজাত আলী দেবীদ্বারের রাজনীতিতে একজন কিংবদন্তি। তিনি একাধারে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, দানবীর, সমাজ সেবক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সফল যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযুদ্ধা, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা প্রতিষ্ঠাতা এবং নিয়ম মেনে চলা একজন প্রথিতযষা ব্যাক্তি।

তিনি ১৯২৬ সালের ২৫এপ্রিল কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ ইউনিয়নের গৌরসার গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি মৌলভী করমউদ্দিন এবং বেগম দুধমেহেরর দ্বিতীয় পুত্র।

ক্যাপ্টেন মো. সুজাত আলী ছাত্র জীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। মাশিকাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক গন্ডি পেড়িয়ে দেবীদ্বার রেয়াজউদ্দিন মডেল সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৪০ সালে অর্থাৎ মাত্র ১৪ বছর বয়সে মাধ্যমিক এবং ১৯৪২ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৪২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ রাষ্ট্রবিজ্ঞান (সম্মান) বিভাগে ভর্তি হন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন কালে তিনি শ্রেষ্ঠ শুটার হিসেবে ইউ.ও.টি.সি পদক লাভ করেন। ওই সালে তিনি ভারতের দেহরাদুরে বৃটিশ ইন্ডিয়া মিলিটারী একাডেমিতে জেন্টেলমেন ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৪৩ সালে রয়েল ইন্ডিয়ান এয়ার ফোর্সে কমিশন পেয়েছিলেন তবে পরে রয়েল ইন্ডিয়ান আর্মিতে স্থানান্তরিত হন। ভারত বিভাগের পরে তিনি পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে যোগদান করেন। পাকিস্তান সেনা বাহিনীতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি যুদ্ধের পদক এবং পাকিস্তান পদক অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালের ১৩ অক্টোবর কিংস্ কমিশন প্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্টে হিসেবে কোয়ার্টার বালুচ রেজিমেন্টে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে ক্যাপ্টেন হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে আসেন।

তিনি মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন। সক্রিয় রাজনীতিতে আসার মানষিকতা নিয়ে ১৯৬৭ সাল থেকেই দেবীদ্বার এলাকায় গনসংযোগ শুরু করেন। এসময়ে তিনি দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।

কলেজটি প্রতিষ্ঠার পেছনে রয়েছে একটি খন্ড ইতিহাস। এ অঞ্চলের মানুষ যখন অজ্ঞতার শ্রোতে বসবাস করছিল। কেউ কেউ মাধ্যমিক স্তর শেষকরে নানা প্রতিকুল পরিস্থিতির কারনে উচ্চশিক্ষায় বাঁধাগ্রস্থ ছিলেন। যে সময় শুধুমাত্র কিছু বিত্তবান, সচেতন ও অন্বেষাপাগল- জ্ঞান অন্বেষায় উচ্চ শিক্ষার জন্য বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়াতেন। ঠিক তখনই এ এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগী একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার ভীষণ প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধী করতে থাকেন। মাধ্যমিক গন্ডি পেড়িয়ে উচ্চ শিক্ষার সিড়িবেয়ে আলোর প্রজ্বলনশীখা ছড়িয়ে দিতে এ অঞ্চলের তৎকালীন রাজনীতিক ও শিক্ষানুরাগী, সাবেক সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের পালোটোনা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রধান যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন সুজাত আলী ১৯৬৮ সালের ১ জুলাই দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারি কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।

এর আগে ১৯৬৭ সালের শেষদিকে দেবীদ্বারে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার গুঞ্জণ শুরু হয়েছিল। ইতমধ্যে কলেজটি দেবীদ্বারে প্রতিষ্ঠা না করে চান্দিনা প্রতিষ্ঠা করার জন্য চান্দিনার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যাক্তি উঠেপড়ে লেগেছিলেন। সংবাদটি পাওয়ার পর নিশ্চিত হতে গৌরসার গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ সরকার(তিনি ২০১৮ সালের শুরুর দিকে ১১৬ বছর বয়সে পরলোকগমন করেন), বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক এবং ফুলতলী গ্রামের আব্দুল হাকিম ভঞাসহ বিশিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি তৎকালিন মুসলিম লীগ নেতা ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর সাথে দেখা করেন। ক্যাপ্টেন সুজাত আলী তৎকালিন পাকিস্তান সরকারের গভর্ণর মোনায়েম খানের সাথে কথা বলেন এবং কলেজটি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় জমি, অর্থের বিষয়ে নিশ্চয়তা দিয়ে দেবীদ্বারেই কলেজ প্রতিষ্ঠার মৌখিক আশ্বাস আদায় করেন।

কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষে প্রথম সভাটি অনুষ্ঠিত হয় দেবীদ্বার রেয়াজ উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সীমানার উত্তর পাশের একটি কক্ষে (যে কক্ষটি এক সময় ‘কৃষি ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার হয়েছিল এবং বর্তমানে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভাড়ায় ব্যবহার হচ্ছে।) প্রথম সভাটি করেছিলেন। উক্ত বৈঠকে বিশিষ্টজনের উপস্থিতিতে কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নানা পরিকল্পনা গ্রহন এবং সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

প্রথম সভায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিলেন,- তাদের মধ্যে- তৎকালীন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক আবদুল বারী, মহকুমা প্রশাসক মোঃ ওসমান গনি  (বিহারী), গৌরসার গ্রামের ক্যাপ্টেন সুজাত আলী (পরবর্তীতে কলেজ প্রতিষ্ঠাতা, সংসদ সদস্য, ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের পালোটোনা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রধান যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা)। ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়র ফার্মেসী  বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা, আজীবন অধ্যাপক, বিজলী বাজার গ্রামের কৃতিসন্তান অধ্যাপক ড. আব্দুল জব্বার। সারদা পুলিশ একাডেমীর অধ্যক্ষ, মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশের প্রথম আইজিপি, স্বরাষ্ট্র সচিব, প্রাণী ও মৎস সম্পদ সচিব, শিক্ষা ও সংস্কৃতি সচিব, সংসদ সচিবালয়ের সচিব, পরবর্তীতে ত্রাণ ও পূনর্বাসন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী, বিশিষ্ট লেখক ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার জিরুইন গ্রামের এডভোকেট আব্দুল খালেক ভইয়া। ঢাকা মহাখালীর আইসিডিডিআরবি ও ‘নিপসমর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও ইমিরেটাস অধ্যাপক গুনাইঘর গ্রামের ডাঃ কফিল উদ্দিন। হামলাবাড়ি গ্রামের ইসমত আলী ডাইরেক্টর। দেবীদ্বার রেয়াজ উদ্দিন মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়র প্রধান শিক্ষক একেএম ফজলুল হোসেন (নোয়াব আলী)। গঙ্গামন্ডল রাজ ইনষ্টিটিউশনর প্রধান শিক্ষক মোঃ শহিদুল্লাহ সোনা মিয়া, মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়র সাবেক প্রধান শিক্ষক ওয়াহেদপুর গ্রামের প্রবীন রাজনীতিক মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আজগর হোসেন সরকার, মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়র সাবেক প্রধান শিক্ষক বানিয়াপাড়া গ্রামের জালাল উদ্দিন আহমেদ, একই বিদ্যালয়র সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুল বারী সহ সকল উচ্চ বিদ্যালয়র প্রধান শিক্ষক, দেবীদ্বার সরকারী প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি ছোটআলমপুর গ্রামের শব্দর আলী মাষ্টার, গৌরসার গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ সরকার, গুনাইঘর দক্ষিণ ইউপি সাবেক চেয়ারম্যান শাকতলা গ্রামের আব্দুল্লাহ ভূঁইয়া, দেবীদ্বার গ্রামের হাজী আকামত আলী পাঠান, শালঘর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল, সুবিল উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান অসুমুদ্দিন সরকার, সুবিল দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান তৈয়ব আলী, ফতেহাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ, দেবীদ্বার সদর ইউপি চেয়ারম্যান আশ্রব আলী পাঠান, একই ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান বনকোট গ্রামের বিশিষ্ট হোমিও চিকিৎসক ডাঃ আব্দুল আলীম মুন্সী, এলাহাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান আজগর হোসেন, জাফর আলী, গুনাইঘর ইউপি চেয়ারম্যান ইসমাইল ভঁইয়া, গুনাইঘর দক্ষিন ইউপি চেয়ারম্যান মাশিকাড়া গ্রামের হাবিব মূন্সী, ধামতী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ, রাজামেহার ইউপি চেয়ারম্যান সামসুল হক ভূঞা, রাজামেহার দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান জুনাব আলী ভূঞা, ধামতী দক্ষিণ ইউপি চেয়ারম্যান রাধানগর গ্রামের জব্বার আলী মূন্সী, মোহনপুর ইউপি চেয়ারম্যান ছোটনার জুনাব আলী খান, বরকামতা ইউপি চেয়ারম্যান বাগুর গ্রামের আব্দুল জব্বার, এলাহাবাদ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ফুলতলী গ্রামের আব্দুল হাকিম ভূঞা, ভিংলাবাড়ি গ্রামের তারু ভূঞা, ভিড়াল্লা গ্রামের আমজাত খান, সামসুল হক খান, হোসেনপুর গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান সুলতান ভূঞা, বারুর গ্রামের আবিদ আলী সরকার, কালিকাপুর গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান ময়নাল হোসেন, তালতলা গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান জুনাব আলী, বিহারমন্ডল গ্রামের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল বারেক, ক্যাপ্টেন সুজাত আলী সাহেবর দোস্ত খোদাইচর গ্রামের আজগর আলী, গৌরসার গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক, দেবীদ্বার গ্রামের ইউনুছ পাঠান, ফতেহাবাদ গ্রামের গোপাল ডাক্তার, ২নং বড়শালঘর ইউপি চেয়ারম্যান পৈরাংকুল গ্রামের আব্দুর রহিম চৌধূরী, দেবীদ্বার গ্রামের ডাঃ সালেহ আহমেদ, ছোটআলমপুর গ্রামের জোহর আলী আমীন, এলাহাবাদ গ্রামের তৎকালীন সময়ের তুখোর ছাত্র নেতা এলাহাবদ ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মুস্তাকুর রহমান ফুল মিয়া মাষ্টার সহ এলাকার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।

কলেজ প্রতিষ্ঠায় দ্বিতীয় সাধারণ সভা এবং কলেজের নামকরণ নিয়ে কিছু কথা,- কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে উপজেলার বিভিন্ন স্তরের গন্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে দ্বিতীয়বারের মতো একটি সাধারন সভা আয়োজন করা হয়। উক্ত সভাটি দেবীদ্বার রেয়াজ উদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়র তৎকালীন জিমনেশিয়াম হলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বারেরা গ্রামের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী আব্দুল গফুর মোল্লার সভাপতিত্বে উক্ত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মৌলভী মফিজ উদ্দিন আহমেদ। ওই সভায় কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বক্তব্য প্রদানকালে ক্যাপ্টেন সুজাত আলী বলেন, চান্দিনায় কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য বিশিষ্ট সমাজ সেবক মোঃ নুরুন্নবী এক লক্ষ টাকা দেয়ার কথা ছিল, তিনি টাকা দিতে পারেননি, তাই আমি এক লক্ষ টাকা দেব কলেজটি দেবীদ্বারে হতে হবে এবং আমার নামে নামকরণ করতে হবে। ওই প্রস্তাবের বিপরীতে আর কোন প্রস্তাব না আসায় উক্ত প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। একই সময় কলেজ প্রতিষ্ঠায় কে কতটাকা অনুদান দেবেন, উন্মোক্ত আহবানে সর্বপ্রথম ক্যাপ্টেন সুজাত আলী ৪৫ হাজার টাকা অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। তার পরই ফুলতলী গ্রামের আব্দুল হাকিম ভূঁইয়া নগদ একশত টাকা প্রদান করেন। পরে অনেকেই এশত/ পঞ্চাশ টাকা করে অনুদান প্রদান করেছিলেন। উপস্থিত ১৬ ইউপি চেয়ারম্যানদের ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্সের সাথে এক হাজার টাকা করে প্রদান করারও সিদ্ধান্ত হয় এবং সাবরেজিষ্টারর সহযোগীতায় দলিল লিখক এবং ষ্ট্যাম বিক্রেতা ভেন্ডারদের মাধ্যমে প্রতিটি দলিলের বিপরীতে একটি নির্দিষ্ট পরিমান টাকা আদায়েরও সিদ্ধান্ত হয়। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি কনভেনিং কমিটি গঠন করা হয়। কনভেনিং কমিটির কনভেনার করা হয় কলেজ প্রতিষ্ঠাতা ক্যাপ্টেন সুজাত আলীর ছোট ভাই দেবীদ্বার রেয়াজ উদ্দিন মডেল সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এ,কে,এম ফজলুল হোসেন (নোয়াব আলী)কে।

উক্ত কলেজ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ক্যাপ্টেন সুজাত আলী দেবীদ্বারবাসীর নজরে আসেন। ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বচনের প্রস্তুতি চলছিল। দেবীদ্বার আসনের প্রার্থী হিসেবে প্রবীন রাজনীতিক বিশিষ্ট আওয়ামীলীগ নেতা মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়র সাবেক প্রধান শিক্ষক ওয়াহেদপুর গ্রামের (পরবর্তিতে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক) আজগর হোসেন সরকার। তিনি অর্থসংকট দেখিয়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অপারগতা দেখান। এ সুযোগটা কাজে লাগান মুসলিমলীগ ঘরানার ক্যাপ্টেন সুজাত আলী। আলীগের মনোনয়ন বোর্ড ক্যাপ্টেন সুজাত আলীকে আলীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালে তিনি বিপুল ভোটে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পর তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতের ত্রিপুরায় (পালাতানা) পালাটোনায় মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। তিনি নিজে সরাসরি কসবা ও ময়নামতি ক্যান্টনম্যান্ট এলাকায় যুদ্ধ পরিকল্পনা গ্রহন পূর্বক যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং কসবা এলাকায় সম্মূখ যুদ্ধরত অবস্থায় আহত হন।

তিনি ১৯৭৩ সালে পুনরায় জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাষ্টের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর নিয়োজিত হন। 

পরবর্তীতে একজন সফল পাট ব্যবসায়ি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বাংলাদেশ পাট সমিতির দুবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৮ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা এফ.এ.ও, আই.এল.ও, ইসকেপ, এবং ডবিøউ.এইচ.ওর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সম্মেলনে যোগদান করেন। তার প্রচেষ্টায় ১৯৮৪ সালে ঢাকায় ‘আন্তর্জাতিক পাট সংস্থা স্থাপিত হয়। তাছাড়া তিনি বিভিন্ন সময়ে টি.এন্ড.বি, বি.আর.আই, আন্তর্জাতিক পাট সংস্থা, পরিকল্পনা অধিদপ্তর, নটরডেম কলেজ এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক সহ বিভিন্ন স্বায়ত্ব শাসিত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের বোর্ড কমিটি ও উপদেষ্টা কাউন্সিল সদস্য পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান কর্তৃক গঠিত জাগদলর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন ও ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে বিপুল ভোটের ব্যাবধানে পরাজিত হয়ে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহন করে আমেরিকায় বসবাস শুরু করেন।

ক্যাপ্টেন সুজাত আলী নিজ এলাকার উন্নয়নে বিভিন্ন এতিমখানা, মাদ্রাসা, স্কুল, কলেজ প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক সহায়তা করেন। ১৯৬৮ সালে দেবীদ্বার সুজাত আলী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তিতে ১৯৮৬ সালে কলেজটি জাতীয়করণ করা হলে, কলেজটি দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারী কলেজ হিসেবে পরিচয় লাভ করে।

প্রতিথযষা এ যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও দানবীর ক্যাপ্টেন সুজাত আলী ২০০৭ সালের ২এপ্রিল শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাস শহরে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাকে তার নিজ প্রতিষ্ঠিত দেবীদ্বার সুজাত আলী সরকারী কলেজ মসজিদের উত্তর পাশে সমাহিত করা হয়।

এবিএম আতিকুর রহমান বাশার,

সাংবাদিক, লেখক, রাজনীতিক ও 

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

০১৮১৯৮৪৪১৮২, ০১৭৬১৭৪০২২৭।


শেয়ার করুন

Author:

Etiam at libero iaculis, mollis justo non, blandit augue. Vestibulum sit amet sodales est, a lacinia ex. Suspendisse vel enim sagittis, volutpat sem eget, condimentum sem.